২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে গচ্ছিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে হ্যাকাররা ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি করে। ঘটনার প্রায় ৪০ দিন পর ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই ঘটনার ১০ বছর পর অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) খসড়া অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করে আইনি মতামতের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে জমা দিয়েছে। গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খসড়া অভিযোগপত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্নভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
দেশের ইতিহাসে বৃহৎ এই অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় দেশে-বিদেশে ব্যাপক তোলপাড় হয়েছিল। শুরু থেকেই মামলাটি তদন্ত করে আসছে সিআইডি। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১১ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির তত্ত্বাবধানে মামলার তদন্ত চূড়ান্ত করা হয় এবং ১ এপ্রিল অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের মতামত চাওয়া হয়। জানা যায়, বাংলাদেশসহ সাত দেশের মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশের ১০ জন, ফিলিপিন্সের ৩৬, উত্তর কোরিয়ার দুই, চীনের তিন, শ্রীলঙ্কার আট, জাপানের এক এবং ভারতের চার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। ১৫০ পৃষ্ঠার খসড়া অভিযোগপত্রে ফরেনসিক এই মামলার প্রমাণ হিসেবে রয়েছে বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ এবং অর্থপাচারের জটিল নেটওয়ার্কের বিস্তারিত বিবরণ। তথ্য-প্রমাণ হিসেবে রয়েছে ১০ হাজার পৃষ্ঠার কাগজপত্র। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত অভিযোগপত্র আদালতে উপস্থাপন করে বিচার কার্যক্রম শুরু করা গেলে তা দেশের আর্থিক খাতে সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা হিসেবে কাজ করবে।
সিআইডির একটি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের অভিযুক্তদের মধ্যে ড. আতিউর রহমান ছাড়াও রয়েছেন আনিস এ খান, কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, শুভংকর সাহা, রেজাউল করিম, জোবায়ের বিন হুদা, এ এফ এম আসাদুজ্জামান, মেজবাউল হক, আবুল কাসেম ও মো. সুলতান মাসুদ আহমেদ। রিজার্ভ চুরির মামলার সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির ফিন্যানশিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমরা শতভাগ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে একটি নির্ভুল খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রস্তুত করেছি। তবে আমাদের এখনো অ্যানালিসিস চলছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের আইনি মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
সিআইডি সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অজ্ঞাতপরিচয় হ্যাকাররা সুইফট পেমেন্ট সিস্টেমে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে গচ্ছিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি করে। জানা যায়, মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের সহায়তায় নর্থ কোরিয়ার হ্যাকার পার্ক জিন হিয়ক ও তাঁর নেতৃত্বাধীন ‘লাজারাস গ্রুপ’কে মূল অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একই সময় ফিলিপিন্সের আরসিবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার হওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলারের গতিপথও শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে চুরি হওয়া অর্থের একটি অংশ উদ্ধার করা গেলেও বড় অংশই উদ্ধার করা যায়নি।
আমরা আশা করি, দ্রুত অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করে আদালতে পেশ করা হবে। আমরা চাই, দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হোক। পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতকে নিরাপদ করতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

